Bh Rubel

Learn and Be Succeed

স্মৃতিচারণ

স্মৃতিচারণ লেখাঃখাইরুন নেছা রিপা

আজ জরুরি একটা কাজে অনেক দূর গিয়েছিলেন রহিদ সাহেব। ফেরার পথে রিক্সাওয়ালা একটা স্কুলের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে রিক্সাওয়ালাকে বললেন, স্কুলের সামনে দাঁড়াতে। রিক্সাওয়ালাও নির্দেশ পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন ঠিক স্কুলের সামনের দিকটায়। রহিদ সাহেব আস্তে পা ফেলে রিক্সা থেকে নামলেন। ভাড়া মিটিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন স্কুলের গেটের কাছে। বুকের বাঁ’পাশটায় কেমন যেন সুক্ষ্ম ব্যথা হচ্ছে। আস্তে আস্তে পা ফেলে এগিয়ে চললেন গেটের ভেতরে। আজ প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পর পা রাখলেন তার প্রিয় স্কুলটায়। কৈশোরটা বেশ আমোদ-ফুর্তিতেই কেটেছিল স্কুলজীবনে। জীবনটা অনেকটা যান্ত্রিক পরিবহনের মতো। সারাক্ষণ চলতেই হয় নয়তো অকালেই মরিচা ধরে ক্ষয়ে যায়। যান্ত্রিক পরিবহনকে নিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে পেছনে তাকোনোর সময় কোথায়? একদম সময় হয়ে ওঠে না। সেই তো বছর পঁয়ত্রিশ আগে স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করে বেড়িয়েছিলেন। তারপর উচ্চ মাধ্যমিক, অনার্স, মাস্টার্স সবশেষে স্থায়ী একটা চাকরি। সেই যান্ত্রিক পরিবহন নিয়ে সর্বদা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কয়েকবার প্রথম প্রথম দরকারে স্কুলে পা রাখলেও সময়ের অভাবে আর পা রাখা হয়নি। চোখের আড়াল তো মনের আড়াল বলেও একটা কথা রয়ে আছে বাংলা প্রবাদে। অনেকদিন স্কুলে না আসাতে স্কুলের প্রতি পুরনো মায়াটা ভাটায় পরিনত হয়ে গেছে।

জীবনে মানুষকে বয়সের কতগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমেই প্রতিটা মানুষের জীবনের পদার্পণ শুরু হয়ে শিশুকাল দিয়ে তারপর শৈশবকাল,তারপর কৈশোর, তারপর যৌবনকাল, সবশেষে বৃদ্ধকাল। আজ সেই ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন রহিদ সাহেব। আজ যেন আবারও সেই পুরনো কৈশোরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে প্রিয় বন্ধুদের সাথে হাসি-গল্পে,আড্ডায় মেতে উঠতে। চোখ থেকে ধীরভাবে চশমাটা খুললেন রহিদ সাহেব। চোখের কোণে বোধহয় একটু জল চিকচিক করছে। স্কুলের রাস্তা ধরে ভেতরে এগুতে লাগলেন ধীর পায়ে। 

কতটা পাল্টে গেছে এত বছরে। আগে স্কুলের বেড়াগুলো টিনের ছিল। আর এখন খাড়া খাড়া দেয়ালে বেশ পরিপাটি দেখাচ্ছে। তখন বর্ষাকালে একদম স্কুলের রাস্তায় পা রাখা যেত না, পুরো কাঁদায় মাখামাখি হয়ে যেত। এখন পাকা রাস্তাই বলে দিচ্ছে এখন আর ছাত্র-ছাত্রীদের বর্ষাকালে একদম কষ্ট পোহাতে হয় না। কী সুন্দর করে রঙ-বেরঙের ফুল গাছে সুসজ্জিত একটি ফুলের বাগান। এসব দেখলে সত্যিই মনটা ভালো হয়ে যায়। কতটা উন্নত হয়ে গেছে সবকিছু। তবুও যেন আজ কিছু জিনিসের ঘাটতি রয়ে গেছে মনে হচ্ছে । হ্যাঁ… তো,রয়ে তো গেছেই সেই প্রিয় বন্ধুগুলো, সেই প্রিয় স্কুল ক্যাম্পাস! সবগুলো হারিয়ে নতুনত্বে সেজেছে। সহসাই বুকটার ভেতর থেকে ডুকরে কান্না বেরিয়ে আসলো রহিদ সাহেবের। কতশত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই স্কুলটার সাথে। পকেট থেকে  রুমালটা বের করে ঝাপসা চোখ জোড়া মুছে নিলেন। হঠাৎ ঘণ্টার শব্দ কানে বাজতেই ভেতরটাতেও ঢং করে একটা শব্দ বেজে উঠলো। ছুটির ঘণ্টা বাজতেই সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটা ক্লাস থেকে ছাত্র -ছাত্রীরা দৌড়ে বেরিয়ে আসতে লাগলো। মনে পরে গেল রহিদ সাহেবের পুরনো সেইদিনগুলোর কথা, প্রতিদিন ছুটির ঘণ্টার আগের মুহূর্তে এভাবে অধীর আগ্রহে বসে থাকতেন কখন ছুটির ঘণ্টা পড়বে। আর সবাই মিলে হুড়মুড় করে ক্লাস থেকে বের হবে। তখন একদম শেষ প্রিয়ডে ক্লাসে মন বসতো না। কখন বাসায় যাবে সে চিন্তায় ব্যাকুল থাকতো সবাই। 

স্কুলটা একদম ফাঁকা, লাইব্রেরিতে কয়েকজন স্যার আছেন এখনো। আচ্ছা রহিদ সাহেবের প্রিয় অংক স্যারটা কী এখনো স্কুলে আছেন? নিজের মনেই হেসে ফেললেন রহিদ সাহেব। এত বছর কী করে থাকবেন? এতদিনে নিশ্চয়ই রিটায়ার্ড হয়ে বাড়িতে আছেন। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে ক্যাম্পাসের একটা ব্যাঞ্চে বসলেন। আগে স্কুলে ক্যান্টিন ছিল না। এখন একটা ক্যান্টিনও দেখা যাচ্ছে। খুব ক্ষুধা লাগছে। ঘড়িতে  প্রায় তিনটার মতো বাজে। কিছু খেয়ে নিলে মন্দ হয় না। ব্যাঞ্চ ছেড়ে উঠে গিয়ে এক কাপ চা সাথে একটা রুটি কিনে আবার আগের স্থানে এসে বসলেন। তখনকার সময়ের সবচেয়ে প্রিয় খাবারের তালিকায় চা আর রুটি থাকতো। আজ আবার অনেক বছর পর সেই প্রিয় খাবার খেতে চলেছেন। না চাইতেও খুব মনে পরছে সেই প্রিয় বন্ধুগুলোকে। কিছু কিনলে কখনো ওদের জন্য শান্তি মতো খাওয়া যেত না। সবাই কাড়াকাড়ি করে নিয়ে সব খেয়ে ফেলতো। আজও সেই একই স্কুল, একই ক্যাম্পাসে বসে আছেন অথচ সেই প্রিয় বন্ধুগুলো কোথায়? কেড়ে নিয়ে খাওয়ার মতোও কেউ নেই। হয়তো যান্ত্রিক পরিবহন নিয়ে তারাও প্রতিণিয়ত ছুটে চলেছে। না চাইতেও এক ফোঁটা অশ্রুকণা চায়ের কাপের ভেতর টুপ করে পরে গেল। চায়ের কাপটা পাশে রেখে চুপচাপ রুটিটা খেয়ে নিয়ে ক্যান্টিন থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিলেন। মাঠটা কী সুন্দর সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত। একসময় এই মাঠে পুরোটা জুড়ে তাদের বিচরণ ছিল। তখন ফুটবল,ক্রিকেট, কত কত খেলা হয়েছিল এই মাঠটায়। আজ খুব বেশিই পরপর মনে হচ্ছে নিজেকে। সত্যিই তো সময়ের ব্যবধানে আজ আর সে এই স্কুলের কেউই হয় না। একসময় ছাত্র ছিলেন। আজ তাকে কেউই চিনবে না। আগের সেই একজন স্যারের দেখাও মিললো না। সবাই হয়তো বুড়ো হয়ে এখন রিটায়ার্ড নিয়েছেন। যেখানে সে নিজেই এখন বুড়োর খাতায় নাম লিখতে যাচ্ছেন সেখানে সেই আমলের স্যারেরা তো আরও বুড়ো হয়ে গেছেন। ভেবেই আনমনে হেসে ফেললেন রিহাদ সাহেব। বিড়বিড় কেরে বলেও ফেললেন,
“সত্যিই বোধহয় বুড়ো হয়ে গেছি এবার।”

একটু বাদেই বোধহয় গেট আটকানো হবে। তাড়াতাড়িই বেড়িয়ে যেতে হবে। নয়তো কে আবার কী ভাববে বলা তো যায় না। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তেই দৌড়ে স্কুলের পেছন দিকটায় চলে গেলেন। যতটা আশা নিয়ে গেলেন ততটা আশাহত হয়ে ফিরে আসলেন। স্কুলের পেছন দিকটায় তখন একটা বাগানের মতো ছিল। যেখানে প্রিয় বন্ধুরা মিলে আড্ডার আসর জমাতো। সবাই মিলে যেন কথার ঝুড়ি নিয়ে বসতো। কথা একবার শুরু করলে যেন কোনো কথা শেষ করা যেত না। কত শত না বলা কথা বন্দুমহলে সবাই উগড়ে দিতো। সময়ের ব্যবধানে সবটা পাল্টে গেছে। এখন কোনো বাগান নেই, সেখানে স্কুলের নতুন একটি ভবন তৈরী হয়েছে। ধীর পায়ে স্কুলের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসতেই মনে পরে গেল একটা ঝালমুড়ি খেলে কেমন হয়? আচ্ছা ওই চাচাটা কী এখনো ঝালমুড়ি নিয়ে বসেন? পরক্ষণেই মনে হলো কিছুক্ষণ আগে যখন স্কুলের ভেতর ঢুকেছিল তখন একটা কম বয়স্ক ছেলেকে দেখেছিলেন। তার মানে সেই লোকটা এখন আর আসে না। হয়তো খুব বৃদ্ধ হয়ে গেছেন তাই কাজ করতে পারেন না। কথাটা মনে হতেই চিনচিন ব্যথা অনুভব করলেন রহিদ সাহেব। ডানহাতটা বুকের কাছে নিয়ে আলতো করে বুলাতে লাগলেন। স্কুল গেট দিয়ে বাহিরে আসতেই দেখতে পেলেন ছেলেটা সব গুছিয়ে চলে যাচ্ছে।  পিছু ডাকলেন রহিদ সাহেব।
“এই যে শুনছো?”
প্রত্যুত্তরে ছেলেটা বললো,
“জ্বে…বলেন।”
–আমাকে কাগজের ঠোঙায় করে একটা ঝালমুড়ি দাও তো।”
ছেলেটা কোনো কথা না বলেই ঝটপট কাগজের ঠোঙায় করে ঝালমুড়ি বানাতে লাগলো। রহিদ সাহেব শীতল দৃষ্টিতে সবটাই পরখ করলেন। ছেলেটা অনেকটা আগের ঝালমুড়ি চাচার মতো করেই ঝালমুড়ি বানায়। কাগজের ঠোঙাটা পেচানোর ধরণটাও হুবহু এক। ঝট করে প্রশ্ন করে বসলেন রহিদ সাহেব,
–রহিম চাচা কে হয় তোমার?”
–আপনি ওনারে চিনেন?”
একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রহিদ সাহেব বললেন,
–কী যে বলো? পুরো পাঁচটা বছর ওনার থেকে ঝালমুড়ি খেয়েছি। আর ওনাকে কী করে ভুলে যাব!”
ছেলেটা একগাল হেসে বললো,
–উনি আমার বাবা।”
মুখে হাসি ফুটে উঠলো রহিদ সাহেবের। যাক অন্তত খোঁজ তো মিললো।
–কেমন আছেন চাচা? খুব বুড়ো হয়ে গেছেন তাই না?”
ছেলেটার মুখ থেকে মুহূর্তেই হাসিটা মিলিয়ে গেল। ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিলো,
–বাবা আর নেই!”
রহিদ সাহেবের মুখের হাসিটাও উবে গেল। একরাশ দুঃখ এসে ভর করলো পুরো চোখ-মুখে। ছেলেটা ঝালমুড়ির ঠোঙাটা এগিয়ে দিয়ে বললো,
–নেন।”
রহিদ সাহেব এক মুঠো ঝালমুড়ি মুখে পুরে দিতে দিতে বললেন,
–দুঃখ করো না। বাবার জন্য সবসময় দোয়া করবে। বড় ভালো মানুষ ছিলেন চাচা। আজ ভাবিনি এই দুঃসংবাদটা শুনতে হবে। মানুষ মাত্রই মরণশীল। কাল হয়তো আমিও থাকবো না, পরশু হয়তো তুমিও। আবার দেখবে নতুন কারো আগমন ঘটেছে। সবই নিয়ম মাফিক চলতে থাকে।”
ছেলেটা চুপচাপ টাকা নিয়ে চলে গেল। রহিদ সাহেব খানিকক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন ছেলেটার চলে যাওয়ার পানে। অনর্থক তাকিয়ে থাকলেন। তারপর দৃষ্টি এড়িয়ে পথ ধরলেন নিজ গন্তব্যে…..

Popular Posts